গ্রামের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো কড়ই গাছটার দিকে তাকালেই রহিম মিয়ার বুকের ভেতর কেমন যেন নড়ে উঠত। এই গাছের নিচেই তার বাবা একদিন তাকে বসিয়ে বলেছিলেন,
“গাছ মানুষকে শুধু ছায়া দেয় না, সময়ের গল্পও বহন করে।”
রহিম মিয়া তখন ছোট। কথার মানে পুরো বুঝেনি, কিন্তু কথাটা মনে গেঁথে গিয়েছিল।
বছর পেরিয়েছে। রহিম মিয়া এখন নিজেই বৃদ্ধ। কড়ই গাছটা আরও বড় হয়েছে, আরও গভীর শেকড় ছড়িয়েছে মাটির ভেতর। এক বিকেলে তিনি তার নাতি রাফিকে নিয়ে সেই গাছের নিচে বসলেন।
রাফি জিজ্ঞেস করল,
“দাদু, এই গাছটা এত পুরনো কেন?”
রহিম মিয়া হাসলেন।
“কারণ, এটা কাউকে তাড়াহুড়া করে বড় হতে দেয়নি। ধীরে ধীরে বড় হয়েছে।”
তারপর তিনি বলতে লাগলেন নিজের বাবার গল্প, সংগ্রামের কথা, মায়ের ধৈর্যের কথা, আর সেইসব দিনগুলোর কথা—যখন মানুষ কম ছিল, কিন্তু ভালোবাসা ছিল বেশি।
রাফি মন দিয়ে শুনছিল। তার চোখে তখন মোবাইলের আলো নয়, গল্পের আলো জ্বলছিল।
রহিম মিয়া শেষ করলেন এই বলে,
“তুই একদিন বড় হবি। তোরও কেউ থাকবে, যাকে তুই গল্প শোনাবি। মনে রাখবি, মানুষ মরেও যায়, কিন্তু তার বলা গল্পগুলো থেকে যায়।”
রাফি গাছের গুঁড়িতে হাত রেখে বলল,
“দাদু, আমি এই গাছটাকে কাটতে দেব না।”
রহিম মিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
তিনি বুঝলেন, প্রজন্ম বদলায়, সময় বদলায়, কিন্তু যদি মূল্যবোধ বেঁচে থাকে—তাহলে মানুষ আসলে কখনো হারায় না।
কড়ই গাছের পাতাগুলো বাতাসে নড়ে উঠল,যেন তারা এই কথার সাথেই সায় দিল।