বিষয়: কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন,কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে কিছু বিনীত প্রস্তাবনা
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আসসালামু আলাইকুম।
আপনার কক্সবাজার সফর উপলক্ষে কক্সবাজার-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং এই জনপদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন আজীবন কর্মী হিসেবে, সর্বোপরি কক্সবাজারের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানাচ্ছি।
কক্সবাজারের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার তালিকা দীর্ঘ। এই জনপদের মানুষ বহু বছর ধরে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছে। আমরা এটাও বুঝি যে একটি সরকার একদিনে কিংবা এক মেয়াদে সব দাবি পূরণ করতে পারে না। কিন্তু কিছু দূরদর্শী, বাস্তবসম্মত ও জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ রয়েছে, যেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে কক্সবাজারের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে পারে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সবসময় উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, স্থানীয় উদ্যোগের বিকাশ এবং জনগণের ক্ষমতায়নের কথা বলতেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলও বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি কক্সবাজারবাসীর পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রস্তাব আপনার সদয় বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করছি।
১. খাল খনন ও জলসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচি
সারা বাংলাদেশের মতো কক্সবাজারেও খাল খনন ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পে স্থানীয় জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্ত করার অনুরোধ রাখছি, যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং জনগণ নিজেদের উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে। খনন শেষে স্থানীয় সমবায় সমিতির মাধ্যমে খালগুলোতে মৎস্য চাষের সুযোগ প্রদান করা যেতে পারে। এর ফলে একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, খাদ্য উৎপাদন, স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে। এটি হবে এমন একটি প্রকল্প, যেখানে সরকারি বিনিয়োগ সরাসরি জনগণের আয়ে রূপান্তরিত হবে।
২. বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে মহাপরিকল্পনায় রূপান্তর।
কক্সবাজারের বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচিকে একটি মহাপরিকল্পনায় রূপান্তরিত করা হোক। এর মধ্যে অধিকাংশ গাছ যেনো হয় ফলজ ও ঔষধি বৃক্ষ , এবং স্থানীয় জনগণকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বনায়ন ও বাগানের অংশীদারীত্ব প্রদান করা হোক। তাহলে এটি শুধু পরিবেশ রক্ষাই করবে না, বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক খাতও তৈরি করবে। স্থানীয় সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানুষকে এই বাগানগুলোর অংশীদার করলে গাছ রোপণ, এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং গাছ থেকে উৎপাদন সব কিছুই যথাযথভাবে সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আজকের একটি গাছ আগামী দশকের একটি সম্পদ। এই কর্মসূচি পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, ফল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
৩. স্মার্ট ও পরিকল্পিত কক্সবাজার গঠন
কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র। তাই এটিকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করার বিকল্প নেই। ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পিত নগরায়ন, সবুজ এলাকা সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের পর্যটন নগরীগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে কক্সবাজারকে হতে হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও সুপরিকল্পিত শহর। অন্যথায় ভবিষ্যতে পর্যটন খাতে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৪. ওয়ান-স্টপ ইয়ুথ সার্ভিস সেন্টার
কক্সবাজারের তরুণ প্রজন্ম আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের মধ্যে মেধা, সম্ভাবনা ও উদ্যমের কোনো অভাব নেই। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগের। কক্সবাজারে একটি আধুনিক ওয়ান-স্টপ ইয়ুথ সার্ভিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হলে তরুণ-তরুণীরা প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান সংক্রান্ত তথ্য, উদ্যোক্তা সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতে পারে। বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বেকারত্ব কমাবে, সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে এবং মাদক ও অপরাধপ্রবণতা হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
৫. মাদক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে জিরো টলারেন্স
কক্সবাজারকে আমরা শান্তি, সৌন্দর্য, সুস্থ বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তির নগরী হিসেবে দেখতে চাই। দুঃখজনকভাবে মাদক এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধ নিয়ে পর্যটক ও স্থানীয় জনগণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ অবস্থা পরিবর্তনে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাদক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং সামাজিক সচেতনতা, সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বর্তমান সরকার এবং বিশেষ করে মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বের প্রতি কক্সবাজারবাসীর আস্থা রয়েছে। তাই এই মুহূর্তটিকে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আজ যদি আমরা দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারি, তাহলে আগামী প্রজন্ম একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কক্সবাজার পাবে।
৬. উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠন ও স্থানীয় কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ
বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উপকূলীয় অঞ্চল, যার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছে কক্সবাজার। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উপকূল ভাঙন এবং জীবিকাগত অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কাঠামো আজ সময়ের দাবি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৩১ দফা কর্মসূচির অন্যতম অঙ্গীকার হিসেবে একটি স্বায়ত্তশাসিত "উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড" গঠন করা যেতে পারে। এই বোর্ড উপকূলীয় অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন, জলবায়ু অভিযোজন, মৎস্য ও লবণ শিল্পের আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চলে বাস্তবায়িত সকল বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পে কমপক্ষে ৭০ শতাংশ স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। উন্নয়নের সুফল প্রথমে স্থানীয় মানুষের ঘরে পৌঁছালে তবেই উন্নয়ন অর্থবহ ও টেকসই হবে।
৭. প্রাচীন নগর রামুকে পৌরসভা ঘোষণা
রামু কেবল একটি জনপদের নাম নয়; এটি কক্সবাজারের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক ও বাহক। তিন লক্ষাধিক মানুষের আবাসস্থল এই জনপদ পৌরসভার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সকল শর্ত পূরণ করলেও এখনো ইউনিয়ন পরিষদ কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ, পরিকল্পিত নগরায়ন, আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রামুর সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বার্থে রামুকে অবিলম্বে পৌরসভা ঘোষণা করা অত্যন্ত জরুরি। আমরা বিশ্বাস করি, রামুকে পৌরসভায় উন্নীত করা হলে এটি কক্সবাজার অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
৮. পর্যটন ও নীল অর্থনীতি মন্ত্রণালয় গঠন এবং সদর দফতর কক্সবাজারে স্থাপন
সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে বিশাল সমুদ্রাঞ্চলের অধিকার লাভ করেছে, তা আমাদের অর্থনীতির জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই বিপুল সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু কক্সবাজার। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর হিসেবে কক্সবাজার শুধু পর্যটনের রাজধানী নয়, ভবিষ্যতের নীল অর্থনীতিরও প্রধান কেন্দ্র হতে পারে। তাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে পর্যটন খাতকে পৃথক করে "পর্যটন ও নীল অর্থনীতি মন্ত্রণালয়" নামে একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন করার প্রস্তাব করছি। একই সঙ্গে, মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পর্যটন ও সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ দক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই মন্ত্রণালয়ের সদর দফতর ঢাকায় না রেখে কক্সবাজারে স্থাপন করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণই নয়, বরং কক্সবাজারকে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথও সুগম করবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমাদের শিখিয়েছিলেন, বাংলাদেশের শক্তি লুকিয়ে আছে তার মাটি, মানুষ এবং উৎপাদনের ভেতরে। সেই দর্শনকে ধারণ করেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সবসময় জনগণের ক্ষমতায়ন, আত্মনির্ভরশীলতা এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের কথা বলে এসেছে।
কক্সবাজারের মানুষ আপনার নেতৃত্বের প্রতি আশাবাদী। তারা অলৌকিক কিছু চায় না; তারা চায় সুযোগ, অংশীদারিত্ব এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ। আমি বিশ্বাস করি, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার একটি অনন্য পর্যটন, পরিবেশ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মডেল হয়ে উঠতে পারে।
আল্লাহ আপনার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং দেশের সেবায় সফলতা দান করুন। আমীন।
কক্সবাজারবাসীর পক্ষে-
বিনীত,
ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সহিদুজ্জামান
সাবেক সংসদ সদস্য, কক্সবাজার-০৩;
সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটি,
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।